টমেটো চাষ: শুরু থেকে একেবারে বিস্তারিত A-to-Z গাইড
-
জমি প্রথমে গভীরভাবে ২–৩ বার চাষ দিতে হবে।
-
আগাছা পরিষ্কার করে 10–12 টন গোবর সার প্রতি একরে মিশিয়ে দিতে হবে।
-
বেড তৈরি করলে পানি নিষ্কাশন ভালো হয়।
-
মাটিতে ট্রাইকোডার্মা মিশিয়ে দিলে মাটি জীবাণুমুক্ত থাকে।
উন্নত জাত নির্বাচনঃ
বাংলাদেশে জনপ্রিয় কিছু উন্নত টমেটো জাত:
-
রূপালি, ইনিয়ান, সৌরভ, আপসারা, অপূর্বা, চেরি টমেটো
-
বিদেশি উন্নত হাইব্রিড: BARI Tomato varieties, Lalima F1, Safal F1, Supra F1
বীজতলা তৈরি ও চারা উৎপাদন
বীজতলা তৈরির পদ্ধতি
-
বালু:মাটি:গোবর = 1:1:1 অনুপাত
-
বীজ বপনের আগে 5 গ্রাম/লিটার পানিতে কার্বেনডাজিম মিশিয়ে বীজ ভিজিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
চারা পরিচর্যা
-
চারার বয়স ২৫–৩০ দিন হলে রোপণের উপযুক্ত।
-
চারায় ৪–৫টি সত্যিকারের পাতা থাকতে হবে।
-
খুব বেশি লম্বা বা চিকন চারা ব্যবহার করবেন না।
মূল জমিতে চারা রোপণ
-
সারি থেকে সারি: ২.৫–৩ ফুট
-
গাছ থেকে গাছ: ১.৫–২ ফুট
রোপণের নিয়ম
-
বিকেলে চারা লাগাতে হবে।
-
চারা বসানোর পর হালকা সেচ দিতে হবে।
-
প্রতিটি গাছের গোড়ায় কাঠি/বাঁশ দিয়ে সাপোর্ট দিতে হবে যাতে গাছ সোজা থাকে।
সার ব্যবস্থাপনা (টমেটোর উচ্চ ফলনের চাবিকাঠি)
গোবর/কম্পোস্ট ৩০–৩৫ মণ
ইউরিয়া ২০–২২ কেজি
টিএসপি৮–২০ কেজি
এমওপি ১৬–১৮ কেজি
জিপসাম৫ কেজি
বোরিক এসিড ২০০ গ্রাম
সার প্রয়োগের সময়সূচি
-
মাটির সাথে অর্ধেক TSP ও MOP মিশিয়ে দিতে হবে।
-
রোপণের ১৫ দিন পর প্রথম টপ ড্রেসিং (ইউরিয়া + এমওপি)
-
রোপণের ৩০–৩৫ দিন পর দ্বিতীয় টপ ড্রেসিং
-
প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ১ বার ইউরিয়া দেওয়া যেতে পারে।
সেচ ব্যবস্থাপনা
-
রোপণের পরপরই হালকা সেচ।
-
গাছে ফুল আসা থেকে ফল বড় হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত সেচ জরুরি।
-
গাছের গোড়ায় পানি জমে থাকা যাবে না—এতে ব্লসম এন্ড রট হয়।
আগাছা ও মাটি ব্যবস্থাপনা
-
প্রতি ১০–১২ দিন পর আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
-
মাটির উপরের অংশ আলগা রাখলে শিকড় দ্রুত বাড়ে।
-
মালচিং (ঘাস/পলিথিন) ব্যবহার করলে আগাছা কমে এবং পানি ধরে রাখে।
টমেটো গাছের রোগ-পোকার দমন
-
লিফ ব্লাইট
-
লিফ কার্ল ভাইরাস
-
ব্লসম এন্ড রট
-
পাউডারি মিলডিউ
সাধারণ পোকা
-
থ্রিপস
-
সাদা মাছি
-
ফল ছিদ্রকারী পোকা
দমন ব্যবস্থা
-
রোগ প্রতিরোধী জাত ব্যবহার
-
বেডে ট্রাইকোডার্মা দেওয়া
-
প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক/ফাংগিসাইড ব্যবহার
-
হলুদ স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করলে সাদা মাছি নিয়ন্ত্রণে থাকে
ফুল থেকে ফল ধরানো (Fruit Setting) টিপস
-
ফুল ফোটার সময় পটাশ সার বাড়াতে হবে।
-
হরমোন স্প্রে (NAA) ব্যবহার করলে ফল ধরার হার বাড়ে।
-
অতিরিক্ত সেচ এ সময় ক্ষতি করে—সেচ কমাতে হবে।
হালকা লাল বা কমলা রঙ হলে সংগ্রহ করা সবচেয়ে ভালো।
বিক্রির উদ্দেশ্যে একটু সবুজ অবস্থাতেও সংগ্রহ করা যায়।
উৎপাদন ও লাভ
উন্নত ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিঘায় টমেটোর উৎপাদন হতে পারে:
-
২৫–৩০ মণ (লোকাল জাত)
-
৩৫–৫০ মণ (হাইব্রিড জাত)
টমেটো চাষে খরচ কম, মুনাফা বেশি—তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে কৃষকেরা প্রতি বিঘায় সহজেই ভালো লাভ পেতে পারেন।
টমেটো শীতকালীন সবজি হলেও, অনুকূল পরিবেশ পেলে এটি সারা বছর চাষ করা যায়। তবে ডিসেম্বরের শীতল আবহাওয়া টমেটোর জন্য খুবই ভালো।
১. জমি বা টব তৈরি এবং চারা রোপণ
উপযুক্ত স্থান নির্বাচন: এমন জায়গা নির্বাচন করতে হবে যেখানে পর্যাপ্ত আলো বাতাস থাকে। টমেটো ২০-২৫°C তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো হয়।
মাটি তৈরি: টমেটো চাষের জন্য উর্বর দো-আঁশ বা এঁটেল দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। টবে বা জমিতে যেন জল নিকাশের সুব্যবস্থা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সার প্রয়োগ (শতক প্রতি): পচা গোবর/কম্পোস্ট (৪০ কেজি), ইউরিয়া (১.২০ কেজি), টিএসপি (৮১০ গ্রাম), এমওপি/পটাশ (৯৭০ গ্রাম) সার প্রয়োগ করতে হয়। শেষ চাষের সময় বেশিরভাগ সার প্রয়োগ করতে হবে।
চারা রোপণ: চারা তৈরির পর (সাধারণত ২০-২৫ দিনের চারা) বিকেলে রোপণ করা উত্তম।
দূরত্ব: সরাসরি বীজ বুনলে, লাইন থেকে লাইন ২০ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারা ২০ ইঞ্চি দূরে লাগাতে হবে। ছাদ বাগানে বড় টবে একটি বা দুটি চারা লাগানো যেতে পারে।
রোপণের পর: চারা লাগানোর পর হালকা সেচ প্রদান করতে হবে। শিকড় যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
২. পরিচর্যা ও সার ব্যবস্থাপনা
সেচ: চারা রোপণের ৩-৪ দিন পর পর্যন্ত হালকা সেচ দিতে হবে। এরপর যখনই মাটির জো (আর্দ্রতা) কমে আসবে, তখনই সেচ দিতে হবে। সার উপরি প্রয়োগের পর জমিতে সেচ দেওয়া জরুরি।
আগাছা দমন: ফসল বোনার ২৫-৩০ দিনের মধ্যে একবার এবং সেচ দেওয়ার আগে আগাছা বাছাই করা উচিত। আগাছা পরিষ্কার রাখলে রোগ-পোকার আক্রমণ কম হয়।
ঠেস বা মাচা দেওয়া (Staking): টমেটো গাছ দুর্বল প্রকৃতির হওয়ায় ফল আসার পর তা নুয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়। তাই বাঁশের কঞ্চি বা অন্য কোনো খুঁটির সাহায্যে গাছকে ঠেস বা সাপোর্ট দিতে হয়। বাণিজ্যিক চাষে মাচা পদ্ধতি ফলন বাড়াতে সাহায্য করে।
ডাল ছাঁটাই (Pruning): ভালো ফলন পেতে গাছের প্রধান কাণ্ড বাদে নিচের দিকে জন্মানো কিছু ডালপালা (যা ফলনের কাজে লাগে না) ছেঁটে বা কাটিং করে দিলে গাছের শক্তি ফলে চলে আসে।
৩. রোগ ও পোকা দমন
শীতকালে টমেটো গাছে নানা ধরনের রোগ ও পোকা (যেমন: জাব পোকা, পাতা কোঁকড়ানো রোগ বা মোজাইক রোগ) দেখা দিতে পারে।
যদি দেখেন পাতার রং অস্বাভাবিক বা পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে, তবে কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সঠিক ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। জৈব পদ্ধতিতে নিম তেল ব্যবহার করেও পোকা দমন করা যেতে পারে।
এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে ডিসেম্বরের অনুকূল আবহাওয়ায় আপনি টমেটো চাষে ভালো ফলন আশা করতে পারেন।
উপসংহার
টমেটো চাষ বাংলাদেশের কৃষকের জন্য একটি লাভজনক ও সহজ চাষাবাদ পদ্ধতি। সঠিক জমি নির্বাচন, উন্নত জাত, যথাযথ সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগ-পোকা দমন—এই চারটি বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে উচ্চ ফলন নিশ্চিত করা যায়। এই গাইডটি অনুসরণ করলে নতুন কৃষকরাও সহজেই পেশাদারের মতো টমেটো চাষ করতে পারবেন।
